রফিকুল হায়দার ফরহাদ
ভলিবল স্টেডিয়ামে চলছিল প্রিমিয়ার ভলিবলে বাংলাদেশ পুলিশ দলের সাথে ঢাকা সবুজ দলের খেলা। গ্যালারিতে বসে পুলিশ ভলিবল দলকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছিলেন ৮-১০ জন নারী। তাদের গায়ে পরা পোশাকই বলে দিচ্ছিল তারা খেলোয়াড়। সামনে গিয়ে কথা বলার সময় স্পষ্ট হলো তারাও ভলিবল খেলোয়াড়। বাংলাদেশ পুলিশের নারী ভলিবল দলের সদস্য। তারা লিগ ম্যাচে গলা ফাটিয়ে প্রেরণা যোগাচ্ছিলেন পুুরুষ দলকে। যারা মাঠে লড়ছেন ২৩তম প্রিমিয়ার ভলিবলর লিগের ম্যাচে। তবে এই চিৎকার দিয়ে গলা ফাটানো ফাল্গুনী, রেখা আক্তার, মিতু আক্তার, শাবনুর, মহিমা আক্তারদের ভলিবল লিগে খেলার কোনো সুযোগ নেই। বছরের পর বছর তারা পুরুষ ভলিবল লিগের দর্শক হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন। কারণ অ্যাডহক কমিটি পেরিয়ে নির্বাচিন কমিটি ফের অ্যাডহক কমিটি, যে মোড়কেই ভলিবল ফেডারেশনে যারা অতীতে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা কেউই আজ পর্যন্ত নারী ভলিবল লিগ চালু করতে পারেননি। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও লিগ ম্যাচের অভাবে নানা ভাবেই বঞ্চিত দেশের নারী ভলিবল খেলোয়াড়রা। দেশের দেশের নারী ভলিবলের উন্নতির স্বার্থেই ভলিবল লিগ চান রেখা, শাবনুর, মাহিমারা।
বাংলাদেশের নারী ভলিবল বলতে এখনো সেই জাতীয় নারী ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপ। এ ছাড়া আছে আন্তঃজেলা ভলিবল। এর বাইরে মাঝে মধ্যে নারীদের দিয়ে উন্মুক্ত ভলিবল হয়। এই উন্মুক্ত ভলিবল সর্বশেষ তিন বছর আগে হয়েছিল। আর যে আন্তঃজেলা ভলিবল হয় তা জাতীয় ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বও। সর্বশেষ আন্তঃজেলা ভলিবলে ৩৫টি দল অংশ নিয়েছিল। সেখান থেকে ১২টি দল চূড়ান্ত পর্ব তথা জাতীয় ভলিবলে প্রতিনিধিত্ব করে। কার্যত এই একটি টুর্নামেন্ট খেলেই চলে ভলিবল খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার। সেখান থেকেই বাছাই করা জাতীয় দলের খেলোয়াড়। যেমন ১৭ ডিসেম্বর যে বাংলাদেশ নারী ভলিবল দল মালদ্বীপ যাবে সেন্ট্রাল এশিয়ান ভলিবল খেলতে তারাও এই জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে এসেছেন।
তাই দেশে নারী ভলিবল খেলোয়াড়দের আরো বেশি বেশি ম্যাচ আয়োজন এবং খেলোয়াড়রা যাতে আরো বেশি টাকা পায় সে জন্য নারী লিগ আয়োজনের দাবি রেখা আক্তারদের। রেখার বক্তব্য, আমরা ভলিবল লিগ খেলার সুযোগ পাই না। কারন লিগইতো কোনো দিন হয়নি। যদি লিগ শুরু হয় এবং তা নিয়মিতই মাঠে থাকে, তাহলে নতুন নতুন খেলোয়াড় যেমন বাড়বে। সে সাথে বেশি বেশি ম্যাচ পাবে খেলোয়াড়রা। পাশাপাশি লিগ হলে খেলোয়াড়রা টাকাও পাবে কিছু। যা এই খেলোয়াড়দের জন্য জরুরি। মাহিমা আক্তার, শাবনুর এবং মিতু আক্তারদের এক সুরে কথা, জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে লিগের কোনো বিকল্প নেই।
তাহলে কেন অতীতে নারী ভলিবল লিগ হয়নি। বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু জানান, জেলাপর্যায়ে তেমন চর্চা নেই নারী ভলিবলের। পাবনা, সাতক্ষীরা, নড়াইলসহ গুটি কয়েক জেলায় নারী ভলিবল খেলোয়াড় পাওয়া যেত। স্রেফই খেলোয়াড় সঙ্কটে নারী ভলিবল লিগ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এই উপমহাসচিব তথ্য দেন, আগে তো ভলিবলে নারী উইংই ছিল না। আমরা ২০১৭ সালের দিকে নারী উইং করে মহিলা ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপ করার উদ্যোগ নেই। এতে টেনেটুনে ১৪টি বেশি দল পাইনি।
অবশ্য ফেডারেশনের বর্তমান অ্যাডহক কমিটি নারী ভলিবল লিগ চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিমল ঘোল ভুলু জানান, আমাদের পরিকল্পনায় আছে নারী ভলিবল লিগ চালু করার। বর্তমানে নারী ভলিবল দল আছে পুলিশ ও বাংলাদেশ আনসারে। এ ছাড়া বাকি তিন বাহিনী, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে চিঠি দেবো তারা যেন নারী ভলিবল দল গঠন করে। কিছু দল পেলেই আমরা নারী লিগ মাঠে নিয়ে যেতে পারব।
অবশ্য নারী জাতীয় ভলিবল দল যাতে সেন্ট্রাল এশিয়ান ভলিবলে ভালো করে সে জন্য ৬ মাস ধরে বিকেএসপিতে অনুশীলন করানো হচ্ছে। নারী দলের এত লম্বা সময় ধরে অনুশীলন এই প্রথম। ১৯-২৫ ডিসেম্বর মালদ্বীপে হবে এই আসর। এতে বাংলাদেশসহ কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা অংশ নেবে। বাংলাদেশ নারী ভলিবল দল এর আগে এই সেন্ট্রাল এশিয়ান ভলিবলে ২০১৯ সালে ৬ দলের মধ্যে পঞ্চম হয়েছিল। তা মালদ্বীপকে হারিয়ে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানকে হারিয়েও পঞ্চম হওয়া। সর্বশেষ আসরে অবশ্য কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি। স্থান ৬ দলের মধ্যে চতুর্থ। এবার যেহেতু বিকেএসপির উন্নত পরিবেশে লম্বা সময় ধরেই অনুশীলন তাই মালদ্বীপের মাঠে ভালো করার প্রত্যয় জানান ভুলু।
এ দিকে পুরুষ ভলিবল দলের জন্য জাপান থেকে আসা কোচ রায়ান মাসাহজেদীকে এখন বসিয়ে বসিয়ে মাসে তিন হাজার ডলার করে বেতন দিতে হচ্ছে। কারণ তার সাথে ফেডারেশনের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত চুক্তি। জানুয়ারিতে এস এ গেমস হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। তাই পুরুষ ভলিবল দলের ক্যাম্প বন্ধ। বিকল্প হিসেবে মাসাজেদীকে ঢাকায় এনে কোচেস ট্রেনিং কোর্স করানো এবং ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচিতে ব্যস্ত রাখতে চায় ফেডারেশন।



