অস্ট্রিকদের ভাষায় যারা কথা বলত তাদেরকে ঋগে¦দে বলা হয়েছে অসুর। বৃহৎ বঙ্গেও এ ভাষার প্রচলন ছিল। বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, গৌড় ও পুণ্ড্র অর্থাৎ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের লোকেরা এ ভাষায় কথা বলত বলে আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প গ্রন্থে তাদেরকে অসুর ভাষাভাষী আখ্যায়িত করা হয়েছে। ভারতের মুণ্ডা ও খাসি ভাষা অসুর ভাষা হিসেবে চিহ্নিত।
প্রাচীন রাঢ় ও সুহ্ম প্রদেশে খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতক থেকে এ অসুর ভাষার প্রচলন ছিল। বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে অসুর ভাষার প্রভাব বিস্তর। কার্পাস, তাম্বুল, মরিচ, লাঙল, ফল প্রভৃতি অস্ট্রিক শব্দ সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ করে পরে বাঙলা শব্দভাণ্ডারে জায়গা পেয়েছে। এ ছাড়া ডাঙা, ডিঙা, মুড়ি, খোকা, খুকি, ঝাউ, খড় প্রভৃতি অস্ট্রিক শব্দ বাঙলা শব্দভাণ্ডারে যোগ হয়েছে। জৈন প্রচারক মহাবীর বাঙলায় এসেছিলেন। লোকেরা তখন ছু-ছু বলে চিৎকার করে তাকে কামড়ানোর জন্য কুকুর লেলিয়ে দিত। ছু-ছু অস্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষা এবং এ থেকেই বাংলায় চু-চু বা তু-তু ধ্বনিতে কুকুর ডাকার রেওয়াজ চালু হয়।
ভারতে আগত আর্যরা এখানকার অসুরদের মুখোমুখি হন। আর্যরা ছিলেন আলপীয় ও নর্ডিক, দুটো ভিন্ন নরগোষ্ঠীতে বিভক্ত। উভয়ের ভাষা আর্য, কিন্তু মাথার খুলির গঠন আলাদা। আলপীয়দের কপাল ছোট, নর্ডিকদের কপাল চওড়া। আলপীয়রা শেখে কৃষিকাজ, নর্ডিকরা করত পশুপালন।
নর্ডিক ও আলপীয়রা ভারতে এসেছিল রাশিয়ার উরাল পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত শুষ্ক তৃণভূমি এলাকা থেকে। প্রথমে আসে আলপীয়রা, তারা অধিবাসী হয় সিন্ধু-কাথিয়াবাড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তামিলনাড়ু উপকূলভাগ ধরে বাঙলা ও উড়িষ্যা ইত্যাদিতে। তাদেরই একটি বড় দল পূর্ব উপকূল ধরে বাঙলায় ও ওড়িশায় আসে। এরাও রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে পারেনি। এদের সংমিশ্রণ ঘটেছিল কিছু পরিমাণে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ভাষাভাষী লোকেদের সঙ্গে।
আলপাইনদের পরে আসে নর্ডিকরা। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫৫০ বছরের মধ্যবর্তী সময়ে। তারা পঞ্চনদের উপত্যকায় বসবার শুরু করে। এরা সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করে, উত্তর ভারত দখল করে। এই নর্ডিকদেরই বলা হয় বৈদিক আর্য। আলপাইনরা স্থানীয়দের সাথে অনেকটা একাকার হয়ে যায়। নর্ডিকরা চায় আধিপত্য ও প্রভুত্ব। তারা উত্তর ভারত দখল করে পূর্বদিকে এগিয়ে আসছিল। তাদের বাহন ছিল ঘোড়া। যা এই ভূমিতে ছিল অপ্রচলিত। ঘোড়ার গতির কাছে সবাই হেরে যেত। কিন্তু তারা প্রথমবার পরাজিত হলো ‘অসুর’ জাতি এবং তাদের যুদ্ধবাহন হাতির কাছে। কারা এই অসুর জাতি?
অনেকের মতে, অসুর হচ্ছেন বাঙলায় আগত সুমেরিয়রা। তারা ছিলেন কৃষিপ্রধান। তাদের উর্বর অববাহিকায় প্রচুর শস্য উৎপন্ন হতো। ছোট ছোট নগরও গড়েন তারা। ব্যবসায়-বাণিজ্যও করতেন। ব্যবসার লেনদেন হতো সোনা ও রুপার পিণ্ড দ্বারা। সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য তারা একটি আইনি কাঠামো গড়ে তোলেন। বৈদিকরা তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ঈর্ষা করত। সুমেরিয়রা চন্দ্র পঞ্জিকার আবিষ্কার করেন, গুণ ও ভাগ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, ওজন ও পরিমাপ প্রবর্তন করেন। নলখাগড়ার তৈরি এক প্রকার কলম দিয়ে মাটিতে লিখে তারা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারতেন। তাদের উদ্ভাবিত লিখন পদ্ধতির নাম কিউনিফরম। বৈদিকরা তাদের অসুর বলে ঘৃণা প্রকাশ করত। আবার এশিরিয়ান রাজা অসুরবাণীপাল (৬৬৯ থেকে ৬৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এর নাম থেকে অসুর কথাটার জন্ম। এসব মতামত আপত্তিদীর্ণ বটে।
বৈদিক সাহিত্যে অসুর কথাটা বহুল ব্যবহৃত। বেদপরবর্তী সংস্কৃত সাহিত্যেও শব্দটি বিস্তর উচ্চারিত। ঋগে¦দে শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে বারবার।
প্রাচীনতম বেদে অসুর ও দেবতা সমার্থক। ইন্দ্র, অগ্নি ও বরুণকে অসুর বলা হয়েছে। অসুরদের নিয়ে নিন্দাবাদ আছে প্রচুর, কটাক্ষ রয়েছে বিস্তর। ঐতরেয় ও শতপথ ব্রাহ্মণে দেখা যায় দেবতা ও অসুরের জন্ম হয়েছে প্রজাপতি থেকে। প্রাথমিক বেদগুলোর পরে অসুরের অর্থ সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। সেটা মন্দের প্রতিভূ, রাক্ষস। এটা তখন ঘটে, যখন আর্যরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন থেকেই অসুর বলতে তারা দেবশত্রুদের বোঝাতে শুরু করে। ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলিতে তারা শুভের প্রতিপক্ষ। মহাভারতের মতে, দেবতার সাথে যারা বিরোধ করে এবং সমুদ্র মন্থনকালে যারা অমৃতের ভাগ থেকে বঞ্চিত হয় তারাই অসুর। এরা অন্ধকারের প্রতীক।
অসুরদের মধ্যে তিনজনকে প্রধান ধরা হয়। এই তিন অসুর হলেন হিরণ্যকশিপু, বলি ও প্রহ্লাদ। এরা অসুরদের ইন্দ্র নামে পরিচিত। পুরাণের অসুরদের মধ্যে ছিলেন মহিষাসুর, শুম্ভ, নিশুম্ভ, মধু, কৈটভ প্রভৃতি।
যুদ্ধরত বৈদিকরা নির্দিষ্ট জনজাতিকে অসুর বলে আখ্যায়িত করতে থাকে। তারা যাদেরকে ‘অপর’ মনে করে, যারা তাদের আধিপত্যের কাছে মাথা নোয়ায়নি, তাদেরই অসুর আখ্যায়িত করা বৈদিকদের প্রথায় পরিণত হয়। মহাভারতের আদিপর্ব অনুযায়ী অসুররাজ বলির পাঁচ পুত্রের নাম থেকে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম রাজ্যের নামকরণ হয়েছে। ‘আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প’ গ্রন্থে বাঙলা দেশের ভাষাকে ‘অসুর’ জাতির ভাষা বলা হয়েছে। (অসুর নাম্ ভবেৎ বাচ গৌড়্রপুন্ড্রোদ্ভব সদা’)।
পৌরাণিক গল্প অসুরদের যেভাবে চিহ্নিত করে, তাতে দেখা যায়, তারা স্থাপত্যকলায় খুব দক্ষ। তারা নাগরিক জীবনের অভিমুখী, ঘরবাড়ি ও নগর নির্মাণে সক্ষম। তারা সমুদ্রবিহার করত। নৌবিদ্যায় পারদর্শী ছিল।
বৈদিক আর্যরা এর কোনোটায় পারদর্শী ছিল না। তারা নগর গড়তে নয়, পারত ধ্বংস করতে। অসুররা পরকালে বিশ্বাসী ছিল না। তারা দেহাত্মবাদের চর্চা করত। দর্শনে তারা অনেকটা ছিল বস্তুবাদী। লোকদেবতার উপাসনা ছিল তাদের মধ্যে। বৈদিকরা তাদের স্বাতন্ত্র্যকে নিকৃষ্টতার চিহ্ন হিসেবে ধরে নেয়।
অসুর বলে নানা অঞ্চলের মানুষকে অপমান করা হলেও বৃহৎ বঙ্গের মানুষকে বিশেষভাবে এই অভিধা দেয় তারা। বৃহৎ বঙ্গ বরাবরই ছিল বৈদিক আর্য সংস্কৃতির বাইরের দেশ। বৈদিক আর্যভাষীরা পূর্বভারতের মিথিলা পর্যন্ত তাদের সংস্কৃতির বিস্তার ঘটালেও বাঙলায় ঢুকতে পারছিল না। বাঙলার সীমান্তে এসে আটকে গিয়েছিল তাদের জয়রথ।
শুরুতেই বলেছি, বাঙলার আদি অধিবাসী ছিল অস্ট্রিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। অস্ট্রিকদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা ছিল কৃষিনির্ভর। তারা কলা, লাউ, বেগুন, নারকেল, পান, সুপারি, হলুদ, আদা প্রভৃতি ফসলের চাষ করতেন। তারা হাতিকে পোষ মানান, ব্যবহার করেন যুদ্ধে। তারা কৌম জনপদ ও প্রাথমিক নগর গড়েন। সুতি বস্ত্র বয়ন ও আখের রস থেকে চিনি তৈরি করতেন তারা। তাদের সমাজে পঞ্চায়েত প্রথা চালু ছিল বলে মনে করা হয়। তাদের সাথে যুক্ত হন দ্রাবিড় ও আলপীয়রা।
তাদের সভ্যতাকে তাচ্ছিল্য করত বৈদিক আর্যরা। তারা অনার্য জনগোষ্ঠী ও আলপীয়দের বলত অসুর, দাস, দস্যু, পনি, নিষাদ, রাক্ষস। তারা বিশেষভাবে অসুর বলত আলপাইনদের, যারা এখানকার জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে গিয়েছিল। বাঙলাকে জয় করা তাদের জন্য যত দুরূহ হচ্ছিল, বাঙলার নিন্দামন্দ ততই বাড়ছিল।
বাঙলার রণহস্তী ঘোড়সওয়ার আর্যদের হারিয়েছিল। তেমনি এই রণহস্তীর খবর পেয়ে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার বিপাশা নদীর তীর থেকে ফিরে যান স্বদেশের দিকে। পরাজিত বৈদিকরা বাঙলাকে অসুর ভূমি আর এখানকার অধিবাসীদের অসুর হিসেবে গালমন্দ করে সান্ত্বনা খুঁজত। এখানকার মানুষের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াইকে তারা অসুরদের বিরুদ্ধে দেবতার লড়াই বলে আখ্যা দেয়। আক্রমণকারীরা দেবতা আর প্রতিরোধকারীরা অসুর। কিন্তু যাদেরকে অসুর বলা হলো, তাদের ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্র, সম্রাট। বাঙলার এই কথিত অসুরদের কাছে হারতে হারতে বৈদিকদের মনে হলো, আমাদেরও সবল রাষ্ট্র ও প্রবল সম্রাটের জরুরত। এর প্রমাণ আছে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘অসুরগণের সঙ্গে দেবগণের যুদ্ধে প্রতিবারই অসুররা আর্যদের পরাহত করছিল। তখন দেবগণ বলল, অসুরদের মতো আমাদের রাজা নেই (‘অরাজতয়’), সেই কারণেই আমরা হেরে যাচ্ছি। অতএব আমাদের একজন রাজা নির্বাচন করা হউক। (‘রাজানম্ করবমহ ইতি তথেতি’)।’
ড. নীহার রঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে স্বীকার করেছেন, বৈদিক যুগে আর্যরা বিহারের মিথিলা পর্যন্ত দখল করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পূর্ব ভারতের আলপাইন মানবগোষ্ঠীর অসুর জাতির কাছে বারবার পরাজিত হয়ে পূর্বভারত দখলের স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কারণ এই অসুর জাতির যেমন ছিল এক বিশাল হস্তীবাহিনী তেমনি ছিল তাদের শক্তিশালী রাজতন্ত্রও। অথর্ব বেদেও বলা হয়েছে ‘একরাট’ কেবল পূর্বদেশে আছে। ‘একরাট’ মানে সার্বভৌম নৃপতি।
এখানে সাম্রাজ্য গড়েন মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। তিনি বৈদিক আর্যদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। মৌর্যরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। গুপ্ত-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময়কাল পর্যন্ত বাঙলায় বৌদ্ধ-ধর্মেরই প্রাধান্য ছিল। গুপ্ত সম্রাটদের আমলেই বাঙলায় প্রথম ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটে। কিন্তু সেই ব্রাহ্মণ্যধর্ম আর্য-ঐতিহ্যমণ্ডিত ব্রাহ্মণ্যধর্ম নয়। বাঙলায় আর্যরা প্রবেশ করল বটে, এখানকার দেবতাদের তারা নিজেদের দেবতা মানল বটে, কিন্তু এখানকার ভাষা-সংস্কৃতিকে অসুর হিসেবে দেখার প্রবণতা ত্যাগ করল না। অসুর আসে যাবতীয় মন্দ নিয়ে, সুরেরা আসে কল্যাণ ও মুক্তি নিয়ে। জিন্দাবেস্তা গ্রন্থেও আছে এই সুর-অসুরের লড়াই।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলোতে প্রধান লড়াই ছিল দেবতা ও অসুরদের মধ্যে। অসুরেরা সংখ্যায় অধিক, তাদের তুলনায় দেবতারা বয়ঃকনিষ্ঠ। অসুররা ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসী। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে তাই তাদের দেখানো হয়েছে বয়োজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে। ঋগে¦দে দেবতাদের কাছে বারবার হারে অসুররা, আর ব্রাহ্মণগ্রন্থাবলিতে অসুররা বারবার জয়ী হয় দেবতাদের বিরুদ্ধে।
কিন্তু কেন দেবতা-অসুর যুদ্ধে দেবতার পরাজয় ঘটত? বৈদিকরা এর ব্যাখ্যায় তৈরি করে নানা গল্প। একটি পৌরাণিক আখ্যান হলো অসুরদের হারানো যেত না সঞ্জীবনী মন্ত্রের কারণে। এই মন্ত্র জানতেন অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য। যুদ্ধ করতে করতে মৃতপ্রায় অসুরদের তিনি মন্ত্র শুনিয়ে সুস্থ করে দিতেন। দেবতারা যখন ব্যাপারটা জানলেন, সিদ্ধান্ত নিলেন এই মন্ত্র চুরি করতে হবে। মন্ত্র চুরির জন্য দেবতাদের উপদেষ্টা বৃহস্পতির ছেলে কচ কৌশল করলেন। তিনি অসুর গুরু শুক্রাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু শুক্রাচার্যের কাছে গিয়ে তার কন্যা দেবযানীর প্রেমে ডুবে যান। প্রেমে ডুবলেন বটে, কিন্তু লক্ষ্য ভুললেন না। দেবযানীর সম্প্রদায় ও তার বাবাকে পরাজিত করতে হবে। সে জন্য চুরি করতে হবে মন্ত্র। অবশেষে নানা কৌশলে কচ মন্ত্রটি শিখলেন। স্বজাতিকে যুদ্ধে জেতাতে সে মন্ত্র প্রয়োগ করলেন।
কিন্তু মন্ত্র পাঠেও যুদ্ধে জয় আসছে না। অসুরকুল দেবতাদের পরাজিত করে সব বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ হস্তগত করে নেয়। দেবতারা বিষ্ণুর সাহায্যপ্রার্থী হন। বিষ্ণু নির্দেশ দেন দেবতারা যেন অসুরদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। দেবতারা অসুরকুলের সাথে কৌশলে বন্ধুত্ব গড়েন। আলোচনায় বসেন এবং স্থির করেন, দুই পক্ষ মিলে সমুদ্রমন্থন করে অমৃত খুঁজবেন। সে অমৃত তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করবেন। তাতে উভয়েরই লাভ। তবে বিষ্ণু দেবতাদের জানান, তিনি এমন কৌশল করবেন, যাতে অমৃত শুধু দেবতারাই ভোগ করেন।
ক্ষীরসাগরে দীর্ঘ সময় ধরে মন্থনের পর ধন্বন্তরি একটি অমৃতের পাত্র নিয়ে উত্থিত হন। তখনই অমৃতের দখল নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অসুররা যাতে অমৃতের পাত্র দখল করতে না পারে সে জন্য পক্ষীরাজ গরুড় পাত্রটি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান।
এ দিকে অসুরদের সামলাতে নাকাল দেবতাদের অনুরোধে বিষ্ণু তার চিত্তহারী মোহিনী রূপ ধারণ করেন এবং যৌবন ও রূপ লাবণ্যে ভুলিয়ে অমৃতের প্রতি অসুরদের মনোযোগ নষ্ট করে দেন। একই সাথে ছলনার আশ্রয়ে অমৃতের পাত্র হস্তগত করে দেবতাদের মধ্যে তা বিতরণ করা শুরু করেন। স্বরভানু নামে একজন অসুর ছদ্মবেশে দেবতাদের দলে লুকিয়ে ছিল। সেও অমৃতের স্বাদ উপভোগ করে অমরত্ব লাভ করে। বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে স্বরভানুর মাথা ও ধড় আলাদা করে দেন। অনবরত কৌশলের মধ্য দিয়ে অসুরদের ওপর দেবতাদের পুনর্বিজয় সম্পন্ন হয়।
উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ্যবাদ এখানে অজান্তেই নিজের মানসিকতা, প্রোপাগান্ডা, কূটনীতি, যুদ্ধ ও বন্ধুত্বের প্রকৃতস্বরূপ তুলে ধরেছে। তার মানস গঠন করেছে শ্রেষ্ঠত্বের অহম আর প্রতিরোধহীন আধিপত্যের নেশা। যদিও বাঙলায় ছিল প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতা, কিন্তু তাকে সে স্বীকার করেনি। তার প্রোপাগান্ডার স্বরূপ হলো আপনাকে দখল ও হনন করতে এলেও সে দেবতা, আপনি প্রতিরোধ করছেন, অতএব আপনি অসুর। তার কূটনীতি হলো আসেন, অমৃত তালাশ করি এবং ভাগাভাগি করি। কিন্তু লক্ষ্য হলো অমৃত বা সুবিধা লাভ করে আপনাকে বঞ্চিত করা। তার যুদ্ধ হলো শঠতা ও প্রতারণা। আমি উত্তম আর তুমি অধম; তোমাকে পদপিষ্ট করার অধিকার নিয়ে জন্মেছি আমি। কিন্তু তুমি যদি এই অধিকার কবুল না করো, তোমাকে পরাজিত করতে সব ছলচাতুরিই আমার জন্য বৈধ, সবই দেবতার কাজের মতো পবিত্র। তার বন্ধুত্ব হলো, তোমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করব, প্রয়োজনে প্রেমেও পড়ব। কিন্তু তা করব তোমার সর্বনাশ ঘটানোর জন্য।
মজার ব্যাপার হলো সেই যে বাঙলার অধিবাসীরা আধিপত্যবাদীদের কাছে চিত্রিত হয়েছিল অসুর বলে, তার ধারাবাহিকতা আজও থামেনি। তার লক্ষ্যও থেকে গেছে প্রায় আগের জায়গায়। আপনার প্রতিটি ভালোকে সে নিকৃষ্ট বলে চিত্রিত করবে। যতক্ষণ আপনি আপনি থাকবেন, ততক্ষণ আপনার মহত্ত্বও কলঙ্ক বিবেচিত হবে। সে নিজেকে অনবরত, অসংখ্য উপায়ে দাবি করবে আপনার উদ্ধারকারী হিসেবে। ফলে বহুমাত্রিক প্রোপাগান্ডা ও চাতুরির জোয়ারে আসলেই কে অসুর আর কে দেবতা, তা শনাক্ত করতে পারার সক্ষমতাই এই ভূমির নিজস্বতার লড়াইয়ের জরুরি পূর্বশর্ত।
লেখক : কবি, গবেষক
[email protected]



