আওয়ামী দুঃশাসন : আজও আঁতকে ওঠেন মুরাদনগরবাসী
- খালিদ সাইফুল্লাহ মুরাদনগর থেকে ফিরে
- ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০০:০০
সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের কথা মনে হলে আজও আঁতকে ওঠেন কুমিল্লার মুরাদনগরের বাসিন্দারা। সে সময়ের প্রতিটি দিন কেটেছে হামলা-মামলা আর গুম আতঙ্কে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিটি পরিবারে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ঘরে ঘুমাতে পারেননি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে অনেক সাধারণ মানুষও। এলাকার সংখ্যালঘুদের জমিজমাও ছিল তাদের শ্যেন দৃষ্টিতে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি তারাও। বিরোধী নেতাকর্মীদের নির্যাতনের সরাসরি ভিডিও দেখানো হতো আওয়ামী লীগ এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনকে। আর অট্টহাসিতে নাকি ফেটে পড়তেন এই রাজনৈতিক ব্যবসায়ী।
মোল্লা মুজিবুল হক। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব। ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই তার জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ নির্যাতনের স্টিম রোলার। লাকসামে একটি দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনিসহ নেতাকর্মীরা বাসে রওনা হন। হঠাৎই মাঝপথে বাসের গতি রোধ করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। জোর করে মুুজিবুল হকসহ অন্যদের বাস থেকে নামিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে তারা। অনেককে চাপাতি, চায়নিজ কুড়ালসহ দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। মোল্লা মুজিবুল হককে কয়েকজন ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে। একপর্যায়ে জ্ঞান হারান তিনি। সন্ত্রাসীরা তখন তাকে মৃত ভেবে ফেলে চলে যায়। তবে সে যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। অনেকক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে হামাগুড়ি দিয়ে একটি মসজিদের কাছে গিয়ে মাথায় পানি নেন। এ সময় এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানেও তার চিকিৎসায় বাধা দেয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশ গিয়ে জোর করে চিকিৎসারত বিএনপি নেতাকর্মীদের বের করে দেয়া হয়। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান তাদের হুমকি দিয়ে বলা হয় মিডিয়ার কাছে আওয়ামী লীগের নাম বলা যাবে না, বলতে হবে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে আহত হয়েছে।
মোল্লা মুজিবুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার নামে ৩০টির বেশি মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখনো মামলাগুলো বহাল রয়েছে। শুনতেছি মামলা শেষ হবে; কিন্তু এখনো হয়নি। যখন কারাগারে ছিলাম তখন আদালতে নিয়ে গেলে বিচারক আদেশ দেয়ার আগেই পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের কারাগারে ফিরিয়ে নিতে একগাদা হ্যান্ডকাফ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকত। তারা আগে থেকেই জানত আমাদের জামিন হবে না। আর আদালতে বিচারক বলতেন, আপনারা জামিন নিয়ে কী করবেন? এর চেয়ে কারাগারে গিয়ে আল্লাহ আল্লাহ করেন। মুজিবুল হক বলেন, ওই সময় অনেক ভয় হতো, মনে হতো যেকোনো সময় মেরে ফেলা হবে। ওই সময়ের কথা মনে হলে আজও গা শিউরে ওঠে। তিনি আরো বলেন, আমরা যখন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছি, জেলে গেছি তখন কায়কোবাদ এমপি বিদেশে থেকেও লোক দিয়ে আমাদের বাড়িতে বাড়িতে চাল-ডাল-তরকারি পাঠিয়েছেন। শিশুদের জন্য চকোলেট-খেলনাসহ বিভিন্ন জিনিস পাঠিয়েছেন। সবার বাড়িতে বাড়িতেই এভাবে পাঠিয়েছেন তিনি। এ রকম একজন নেতার কারণে আমরা বিপদের মধ্যে টিকে গেছি।
কামালউদ্দিন ভূঁইয়া। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। সেসব দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে গুম হতে হতেও বেঁচে যাই। সাংবাদিকদের তৎপরতা আর প্রবাস থেকে সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের চেষ্টায় সে যাত্রায় রক্ষা পাই। পাসপোর্টের কাজে শহরে যাওয়ার পর ফিরে আসার সময় সাদা পোশাকে একদল লোক আমার গতি রোধ করে। কামালউদ্দিন বলেন, তখন আমাকে তুলে নিয়ে গুম করবে বলে ভয় পেয়ে যাই। তবুও পরিচয় জানতে তাদের চ্যালেঞ্জ করি। পরে পুলিশ স্থানীয় এক নেতা ও তার পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক স্বীকার করে। কিন্তু গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা থানায় খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ পুরোপুরি অস্বীকার করে। এর মধ্যে আমাকে নিয়ে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির পর আবার থানায় নিয়ে আসে। গভীর রাতে স্থানীয় এক সাংবাদিক সেখানে তাকে গারোদে দেখে ফেলার পর পুলিশ তাকে আটকের খবর স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভোর ৫টা পর্যন্ত চলে সেই লুকোচুরি খেলা। অবশেষে সকাল ৯টায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠাতে বাধ্য হয় পুলিশ।
কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচতে পারলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে। আমাদের অনেক নেতা বাসায় কখনোই ঘুমাতে পারেননি। ৬৯টি মামলায় উপজেলার পাঁচ হাজার নেতাকর্মীর নাম দেয়া হয়। এর মধ্যে দুই হাজার নেতাকর্মীকে কারাবরণ করতে হয়েছে। নির্মম নির্যাতনে মারা গেছেন তিনজন। আর অসংখ্য নেতাকর্মী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারা আমাদের নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে বেঁধে নির্মম নির্যাতন করত, তারা সেগুলো ভিডিও লাইভে আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনকে দেখাত। তখন এমপি অট্টহাসি দিতেন আর আরো বেশি বেশি করে নির্যাতন চালাতে বলতেন। একইভাবে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ফারুক আহমেদ বাদশার ওপর চারবার হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করেছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় ২৪টি মামলা। কারাবরণ করতে হয়েছে পাঁচবার। বিএনপি কর্মী নায়েব আলীর বিপক্ষেও আছে অসংখ্য মামলা। তার একটি মার্কেট ভেঙে ফেলে আওয়ামী দখলবাজরা। হেদায়েত হোসেন নামে এক বিএনপি কর্মীকে নির্মমভাবে পেটানোর ভিডিও দেখানো হয় ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনকে। এভাবে গত সাড়ে ১৫ বছরে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ওই এলাকার অসংখ্য মানুষ।
শুধু বিএনপি নেতাকর্মীই নয়, এলাকার সংখ্যালঘুরাও তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটি স্কুলের কর্মচারী রতন ভক্ত নয়া দিগন্তকে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল, তার ভাই আলমগীর ও শামীম আমাদের জমি দখল করে নেয়। আমরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। থানায় গেলে তারা আমাদের মামলা নেয়নি। পরে আমাদের নামেই মামলা ও আমার ভাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় রক্তাক্ত জামাও ছিনিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। এভাবেই আমাদের সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মুরাদনগর পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি দুলাল দেবনাথ নয়া দিগন্তকে বলেন, গত আওয়ামী লীগ আমলে মুরাদনগরের সংখ্যালঘুরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। পুকুর-বাড়িঘরও লুটপাট করেছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। অথচ আমরা কায়কোবাদ এমপির আমলে অনেক নিরাপদ ছিলাম। তখনই আমরা বেশি নিরাপত্তা পেতাম।
মুরাদনগরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেলেও নতুন করে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। এলাকায় যারা এতদিন নির্যাতিত হয়েছেন তাদের অনেকে আবার কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। প্রশাসনের বিমাতাসুলভ আচারণের কারণে এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে বলে তারা জানান। বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, ৫ আগস্ট সাধারণ জনতা থানা-পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন সাবেক এমপি কায়কোবাদের অনুরোধে আমরা থানায় পাহারা দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করি। কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দিইনি; কিন্তু সেই পুলিশ এখন আবার বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে। আর বিএনপির পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হলেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না পুলিশ। বরং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রশাসন থেকে প্রশ্রয় পাচ্ছে। অনেকে নতুন রাজনৈতিক দলেও আশ্রয় নিয়েছে।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর এ থানায় দুইজন ওসি বদলি হয়েছেন। আমি তৃতীয় ব্যক্তি। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। জাতীয় নাগরিক কমিটির কার্যক্রমে সহায়তা করছি। গত ১৫ বছরে এলাকার রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় জনভোগান্তি রয়েছে বলে তিনি জানান।
কুমিল্লা-৩ আসনের সাবেক এমপি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, থানা-প্রশাসন জনগণের সেবা পাওয়ার স্থান। যারা জুলুমের শিকার তাদের প্রতিকার পাওয়ার স্থান; কিন্তু গত ১৭ বছরে মানুষ প্রশাসন থেকে কোনো ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার পায়নি। পুলিশ বাদি হয়েও অনেকের নামে মামলা দেয়া হয়েছিল। এ জন্য মানুষের মনে ক্ষোভ ছিল। মানুষ থানা আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল। আমি তুরস্ক থেকে ফোন করে জনগণকে আইন নিজেদের হাতে তুলে না নেয়ার অনুরোধ করলে তারা হামলা না করে আরো পাহারা দেয়। সে জন্য ওই সময়ের ওসি-এসপি আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আল্লাহর রহমতে দেশ এখন স্বাধীন হয়েছে। মানুষ আশা করেছিল এখন আর আগের মতো পরিস্থিতি হবে না; কিন্তু গত ছয় মাসেই তিনজন ওসি বদলি হয়েছে। এএসপি বদলি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে অনেককে বদলি করা হয়েছে। যারা নতুন দল করবে তাদের পারমর্শে নতুন ওসি-এসপি দেয়া হয়েছে, অতীতে যেমন আওয়ামী লীগ করেছিল। এতে মুরাদনগরবাসী ক্ষুব্ধ-স্তম্ভিত। জনগণের কাছে এটি এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। এখানে বিএনপির নতুন কোনো কমিটি হচ্ছে না। নতুন কাউকে দলে নেয়া হচ্ছে না। অন্য দিকে ছাত্রদের দলে অনেক আওয়ামী লীগার ঢুকে গেছে। তারা প্রশাসনকে কন্ট্রোল করছে। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে না।
আরো সংবাদ
-
- ৫ঃ ৪০
- খেলা
-
- ৫ঃ ৪০
- খেলা